অনিশ্চয়তার মুখে কদম রসুল সেতু
রেলওয়ের জমি বুঝিয়ে না দিলে বন্ধ হতে পারে পাইলিং, ঝুঁকিতে বহুল প্রতীক্ষিত প্রকল্প
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় ধরে শহর ও বন্দরবাসীর প্রত্যাশার পর অবশেষে শুরু হয়েছিল বহুল প্রতীক্ষিত কদম রসুল সেতুর নির্মাণকাজ। তবে শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই রেলওয়ের জমি নিয়ে দাপ্তরিক জটিলতায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়া না হলে যেকোনো সময় সেতুর নির্মাণকাজ থমকে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শীতলক্ষ্যা নদীর দুই পাড়ে ইতোমধ্যে সেতুর পাইলিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশের কাজ এগিয়ে গেছে। নদীর পূর্ব পাশে বন্দর এলাকায় এপ্রোচ সড়কসহ মূল সেতুর পাইলিং ও কেপিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। একইভাবে পশ্চিম পাশে শহর এলাকায় নদীর কাছাকাছি অংশের পাইলিংয়ের কাজও শেষ হয়েছে।
এখন শহরের কালীরবাজার এলাকার দেলোয়ার টাওয়ারের পাশের কুমুদিনী এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ কলেজের কাছাকাছি পর্যন্ত সিরাজউদ্দৌলা সড়কের পূর্ব পাশে পাইলিং কাজ শুরু করার প্রস্তুতি রয়েছে। কিন্তু ওই অংশের জমি রেলওয়ের মালিকানাধীন হওয়ায় সেতু কর্তৃপক্ষ এখন জায়গা বুঝে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) মধ্যস্থতায় রেলওয়ের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় জায়গা সেতু কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত বিষয়টির সুরাহা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, নাসিকের উদ্যোগে সেতু কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের মধ্যে দ্রুত একটি বৈঠক হলে জটিলতার সমাধান করা সম্ভব হতে পারে।
এদিকে, সময়মতো জায়গা বুঝিয়ে না দিলে সেতু নির্মাণে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি সরিয়ে নিতে হতে পারে। এতে শুধু কাজের গতি ব্যাহত হবে না, প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর শহরের ৫ নম্বর ঘাটের সঙ্গে বন্দর উপজেলার একরামপুরকে যুক্ত করার লক্ষ্যে কদম রসুল সেতুর নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর নির্মাণাধীন এই ক্যাবল-স্টেড সেতুটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ সেতু প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেতুটি বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দরের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি যানবাহন চলাচল ও পণ্য পরিবহনে সময় কমার পাশাপাশি নগর অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেতুর নির্মাণকাজ উদ্বোধনের সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, জেলা প্রশাসক রায়হান কবির, নাসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নূর কুতুবুল আলম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আজগর হোসেন, এলজিইডির প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসানুজ্জামান এবং কদম রসুল সেতু প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী হরি কিংকর মোহন্তসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনের সময় নাসিকের তৎকালীন প্রশাসক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেছিলেন, সেতুটি নির্মাণ হবে কি না—এ নিয়ে মানুষের মধ্যে একসময় সন্দেহ ছিল। তিনি নির্মাণকাজ চলমান রাখার বিষয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করেছিলেন। মূল নির্মাণকাজ শুরুর মধ্য দিয়ে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। একই সঙ্গে ল্যান্ডিং পয়েন্ট নিয়ে যানজটের আশঙ্কা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর আগ থেকেই একটি মহল প্রকল্পটির বিরোধিতা করে আসছে। পরবর্তী সময়ে সেতুর র্যাম্প বা এপ্রোচ সড়কের ল্যান্ডিং পয়েন্ট নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে নির্মাণকাজ বন্ধের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও গত বছরের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জ পৌর পাঠাগারে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় শহরের সুধীজন ও সচেতন নাগরিকরা যেকোনো মূল্যে সেতুর নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দেন।
এ বিষয়ে কদম রসুল সেতু প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী হরি কিংকর মোহন্ত বলেন, “সিরাজউদ্দৌলা সড়কের কুমুদিনী পয়েন্ট পর্যন্ত আমাদের পাইলিংয়ের কাজ প্রায় শেষ। এখন যদি আগামীকাল ওই পয়েন্ট থেকে ১ নম্বর রেলগেট এলাকা পর্যন্ত জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা আগামীকাল থেকেই সেখানে পাইলিংয়ের কাজ শুরু করতে পারব।”
তিনি আরও বলেন, “অন্যথায় কাজের জন্য থাকা ইকুইপমেন্টগুলো ফেরত পাঠাতে হবে। এগুলো বসিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাছাড়া রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জায়গাটির বিষয়ে আমাদের সরাসরি কোনো কথা হয়নি। বিষয়টি এখন সিটি করপোরেশনের উদ্যোগের ওপর নির্ভর করছে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুরু হওয়া কদম রসুল সেতুর নির্মাণকাজ কোনো দাপ্তরিক জটিলতা বা সমন্বয়হীনতার কারণে যেন থেমে না যায়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ দ্রুত আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা শহর ও বন্দরবাসীর।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...