লিবিয়া থেকে সমুদ্রযাত্রা, ৩৮ দিনেও সন্ধান নেই সোহেল রানার
৪২ জনকে নিয়ে যাত্রা করা নৌযানটিরও হদিস নেই, উৎকণ্ঠায় স্বজনরা
নিজস্ব প্রতিনিধি:
উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার সোহেল রানা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরও ৪১ জন। গত ১৭ জুলাই লিবিয়ার তদ্রু থেকে যাত্রা শুরুর পর প্রায় ৩৮ দিন পেরিয়ে গেলেও পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই তাঁর। ছেলে কোথায়, কেমন আছেন—কোনো প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না পরিবারের কাছে।
প্রতিদিন একটি ফোনকলের অপেক্ষায় দিন কাটছে সোহেলের বাবা আলী হোসেনসহ স্বজনদের। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে তাঁদের উৎকণ্ঠা।
সোহেল রানার বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের কলচুরি গ্রামে। পরিবারের দাবি, গত ১৭ জুলাই লিবিয়ার তদ্রু থেকে মোট ৪২ জনকে নিয়ে একটি নৌযান সমুদ্রপথে ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এরপর থেকেই সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
‘ছেলে বেঁচে আছে কি না, সেটাও জানি না’
সোহেলের স্বজনদের চোখে এখন শুধু কান্না আর অনিশ্চয়তা। কখন ফোনটি বেজে উঠবে, ওপাশ থেকে সোহেলের কণ্ঠ শোনা যাবে—এই আশাতেই দিন পার করছেন তাঁরা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সোহেলের সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগের পর থেকে তাঁকে আর ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। পরিচিতজন ও বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্বজনদের আকুতি, সোহেল জীবিত থাকলে যেকোনোভাবে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হোক। আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটে থাকলে অন্তত প্রকৃত তথ্য পরিবারকে জানানো হোক।
৪২ জনের সেই যাত্রার পর কী ঘটেছে?
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোহেলসহ মোট ৪২ জন লিবিয়ার তদ্রু থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এরপর তাঁদের নৌযান বা যাত্রীদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে পরিবারের কাছে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
পরিবারের অভিযোগ, এই সমুদ্রযাত্রার ব্যবস্থা করার সঙ্গে সাব্বির ও রিপন নামে দুই ব্যক্তি সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁদের মাধ্যমে যাত্রার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে পরিবারের দাবি। তবে এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদন তৈরির সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
ফলে ৪২ জনের সেই নৌযানের কী পরিণতি হয়েছে, তাঁরা কোনো উদ্ধার অভিযানের আওতায় এসেছেন কি না, কিংবা অন্য কোথাও পৌঁছেছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
ভূমধ্যসাগরের পথে কত পরিবারের স্বপ্ন ভেঙেছে
লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার পথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনিরাপদ ও অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌযান, বৈরী আবহাওয়া, জ্বালানি ও খাবারের সংকট এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভেসে থাকার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে।
বিগত বছরগুলোতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বহু অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন। আবার অনেকের কোনো সন্ধানও পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনায় শুধু একজন মানুষই হারিয়ে যান না—অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, অপেক্ষা ও ভবিষ্যৎ।
সোহেল রানার পরিবারও এখন সেই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
‘আর কোনো পরিবার যেন এমন অপেক্ষায় না থাকে’
ভালো জীবনের আশায় বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ছিল সোহেলের পরিবারেরও। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে দুশ্চিন্তা আর অপেক্ষায়।
সোহেলের বাবা আলী হোসেনসহ পরিবারের সদস্যরা চান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশি দূতাবাস এবং অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখুক। ৪২ জনকে নিয়ে যাত্রা করা নৌযানটির অবস্থান এবং যাত্রীদের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না, তা দ্রুত অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সোহেল জীবিত থাকলে তাঁকে খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন স্বজনরা। আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটে থাকলে সত্যিটা যেন পরিবার জানতে পারে—এটাই তাঁদের শেষ চাওয়া।
প্রায় ৩৮ দিন ধরে একটি ফোনকলের অপেক্ষায় সোহেলের পরিবার। প্রতিটি অচেনা নম্বরে ফোন এলেই বুক কেঁপে ওঠে—হয়তো এবার সোহেলের খবর পাওয়া যাবে।
কলচুরি গ্রামের এই পরিবারের অপেক্ষার শেষ কোথায়, সোহেল রানা কোথায়—সেই উত্তর এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানের অপেক্ষায়। একটি জীবনের সন্ধান শুধু একটি পরিবারের প্রত্যাশা নয়; একই সঙ্গে ৪২ জনকে নিয়ে সেই সমুদ্রযাত্রার প্রকৃত পরিণতি জানারও দাবি।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...